Skip to Content

অপরিবর্তনের বিবর্তন​

-তার মানে আপনি একটি বই লিখছেন?

কিছুটা অপ্রস্তুতভাবে জিজ্ঞেস করলেন নাইম সালেহ।

-উহু, একটা বই আমাকে লিখছে।

চোখ বন্ধ করে দুদিকে ঘার ঝাড়া দিয়ে সুধরে দিলেন সেলিম মির্জা।


নাইম সালেহ জানেন না যে, তাঁর বাসায় যে লোকটা এসেছন; তিনি একটু পরই মারা যাবেন। হয় কোনো সড়ক দুর্ঘটনায়, হয় ছিনতাইকারীর হাতে, নতুবা অন্য কোনো উপায়ে।


দুপুরের এই সময়টায় কেউ কারো বাসায় চা খেতে আসেনা। এই সময়টা হল খাবার পর একটা ঘুম দেবার। সাধারণত ছুটির দিনে এটাই করে থাকেন নাইম সালেহ; তাই খানিকটা বিরক্তির ছাপ তার চেহারায়। তবে মনে হচ্ছেনা এই বিরক্তির কোনো তোয়াক্কা করছেন না সামনের সোফায় বসে থাকা লোকটা; কিংবা তিনি হয়তো খেয়ালই করছেন না এসব। লোকটার হাতে একটি বই দেখা যাচ্ছে; এই বইটা নিয়েই নাকি কথা বলতে চান তিনি।


এরকম লোকের দেখা প্রায়ই মিলে, নতুন লেখকরা যখন সাইকোলজি কিংবা রহস্য ঘটিত কোনো গল্প বা উপন্যাস নিয়ে কাজ করে, তখন কিছু রেফরেন্স কিংবা সাইকোলজির কোন শাখা নিয়ে আলোচনা করতে আসে তারা। নাইম সালেহ বেশিরভাগ সময়ই এদের সাহায্য করে থাকেন। কিন্তু মাঝে মাঝে এমন অদ্ভুত সব কাহিনী নিয়ে মানুষজন হাজির হন যে বিরক্ত না হয়ে পারা যায় না। এই লোকটাও

কি সেরকম অদ্ভুত কিছু নিয়ে এসেছেন?


লোকটা খুব বিব্রত বোধ করছে, বারবার বইটির দিকে তাকাচ্ছে। ক্রমাগত বাম হাঁটু নাচাচ্ছে। কখনো বা ঘড়ির দিকে, দু একবার নাইম সালেহ-র চোখে চোখ রাখছে। আবার হঠাৎ হঠাৎ চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে সারা ঘরে। এটা এই বাসার ড্রয়িং রুম, খুব পুরনো ধাঁচের বানানো বলে দৈর্ঘ্যে খুব বড় বলা যায় ঘরটাকে। ঘরের একেবারে মাঝামাঝি জায়গায় বসানো এক সেট সোফা আর টেবিল। টেবিলে ভদ্রতা স্বরূপ সার্ভ করা আছে এক গ্লাস পানি, একটা পিরিচে কিছু নোনতা বিস্কুট ও আরেকটাতে কিছু বাকরখানী। এ বাসার সব আসবাবপত্রের মতো সোফা সেটটাতেও পুরনো কাঠের দক্ষ হাতের কাজের নিদর্শন পাওয়া যায়। দেখে মনে হচ্ছে দু-তিন বছর হল পলিশ করা হয়েছে। ঘরের মূল ফটক এই ড্রইংরুমেই, দরজা দিয়ে ঢুকে এই সোফা সেট, আর তা পেরোলেই ঘরের দৈর্ঘ্যের সাথে মেলানো লম্বা এক বারান্দা। বারান্দার দরজার দু'পাশে দুটি করে চারটি জানালার আলোতে ভরা ঘরটা হাসনাহেনার গন্ধে ম'ম' করছে। গাছটা কোথায়, বারান্দায়? নাইম সালেহ'র জিজ্ঞাসায় চিন্তায় ছেদ পরল সেলিম মির্জার,


নাইমের ভ্রু কুচকানো দেখে কথা চালিয়ে গেলেন তিনি।

-বইটার নাম Your Will. বইটা যখন প্রথমবার হাতে নিয়ে পড়া শুরু করি, তখন একেবারে থ মেরে গেছিলাম।

-কেন?

-এই বইয়ের গল্পের মেইন ক্যারেক্টার এর নাম সেলিম। তার স্ত্রীর নাম সুরা, দুটো বাচ্চা আছে, একটা সাত বছর বয়সী মেয়ে নিলু, আর আরেকটা চার বছর বয়সী ছেলে রাফি।

-হুম, তো?

-আমার নাম সেলিম, আমার স্ত্রীর নাম সূরা। আর আমার মেয়ে নীলুর বয়স সাত, ছেলে রাফির বয়স চার।

-এমনটা হতেই পারে, কোইন্সিডেন্স বলেও একটা শব্দ আছে।


মুচকি একটা‌ হাসি খেলে গেল লোকটার ঠোঁটে। 


-তাই বলে একটা ইংরেজি বইয়ে? আরে এমনটা হলে আমি আপনার কাছে আসতাম না। এই বইয়ে আমার জন্ম তারিখ, বিয়ের তারিখ, স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি, পুরাতন-নতুন ঠিকানা, এমনকি ছোটবেলায় জেঠুর বাড়ি থেকে আমার চুরি করা রুপার বেল্টের দামি ঘড়িটার কথাও গল্পাকারে আমার জীবনের মত পর্যায়ক্রমে বলা আছে। অথচ ওই চুরি করা ঘড়িটার কথা আমি ছাড়া তামাম দুনিয়ার কেউ জানে না। এতটা  কোইন্সিডেন্স কিভাবে সম্ভব বলুন?

-হুম, আপনি বইটা পেয়েছিলেন কোথায়?

''আজ থেকে প্রায় তিন মাস আগে, নিউমার্কেটের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছিলাম একটা বইয়ের খোঁজে। তখনই আমার চোখ পরে ওই বইটার দিকে। প্রচ্ছদটা খুবই সাদামাটা, লাল রঙের ব্যাকগ্রাউন্ড এর মাঝে সাদা ক্লাসিক ফন্টে লেখা, "Your Will", রাইটারের নাম "You". কনসেপ্টটা ভালো লাগায় দরদাম করে ১২০ টাকায় কিনে নেই ওটা।

রাতে ওটা নিয়ে পড়তে বসলাম। প্রথম লাইন পড়তেই ভ্রু কুঁচকে গেল। "A cashier at Palli Bidyut Office, Azimpur, Salim Mirza used to have green tea since 2013, but nowadays he prefers coffee." 


আরো কয়েকটা পৃষ্ঠা পড়ে রীতিমত নিজের শরীরে চিমটি কাটতে শুরু করলাম নিজের অস্তিত্বের জানান পেতে। তারপর কিছুক্ষন বইটা উল্টেপাল্টে দেখলাম, বিশ্বাস করতে পারছিলাম না যে ১২০ টাকার বিনিময়ে আমি নিজের বায়োগ্রাফি কিনে এনেছি ফুটপাত থেকে!"


কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে রাখলেন নাইম সালেহ। তারপর জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে লোকটাকে বললেন,

"আচ্ছা ধরুন, আপনি পড়তে পড়তে বর্তমানে চলে এলেন, মানে আপনার পড়া শেষ। এরপর আপনার জীবনে আর কিছু হয়নি। তখন? তখন কি বই শেষ হয়ে গেছে?"

-না।

-না মানে? তার মানে এই বই ভবিষ্যৎ বলতে পারে?

-না, তবে ভবিষ্যৎ চ্যুজ করতে পারে।

-মানে?

-আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সর্বোচ্চ তিনটা অপশন থাকবে, আপনাকে একটা বেছে নিতে হবে।

-বাটারফ্লাই ইফেক্টে লিখা বই। আপনার সিদ্ধান্ত অনুযায়ি গল্প এগোবে। ভুল সিদ্ধান্তে গল্প শেষ।

-হ্যাঁ, ওরকমই।

-তাহলে আপনি অপশনগুলো আগে পড়ে দেখেননি?

-না।

-কেন?

-ইচ্ছে হয়নি।

-ইচ্ছে হয়নি মানে?


নাইম সালেহ এবার যেন একটু বিরক্ত হলেন, সেই বিরক্তিকর চাহনিটাই যেন ছুড়ে দিলেন সেলিম মির্জার দিকে। বলছে কি লোকটা? যে সিদ্ধান্তের মধ্যে তার আসন্ন ভবিষ্যত লুকিয়ে আছে, সেই সিদ্ধান্তের ফলাফল পড়তে ইচ্ছা হয়নি?


-বলতে কি চাইছেন আপনি?

-ব্লক, রিডার্স ব্লক।

-কি? সামান্য রিডার্স ব্লকের কারণে আপনি ওগুলো পড়েননি?

-সামান্য বলবেন না, বলুন অসামান্য। আপনি পারবেনই না, যত চেষ্টাই করুন। একটা পৃষ্ঠাও পড়া যায় না। চোখ লাল হয়ে পানি বের হওয়া শুরু হবে। অনেক, অনেকবার চেষ্টা করেছি। আর কতবার যে ঘুমিয়ে পড়েছি তারও হিসাব নেই।


-তাহলে সামনেরটুকু পড়া যায় কিভাবে?

-সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলে।

-সেটা কিভাবে?

-মনে মনে নিলেই চলে। তাহলে আপনি আপনার ভবিষ্যৎ পড়তে পারবেন।

-ভবিষ্যৎ বলতে, কতটুকু?

-আসলে বইটা একটা ডাইরির মত। এখানে সবকিছু সংক্ষেপে বর্ণনা করা থাকে। আর জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর আধিক্যই বেশি। তবে হ্যাঁ, বইটা পড়ে আপনার মনেই হবে না যে এটা অন্য কারো লেখা। মনে হবে যে আপনিই এইমাত্র লিখে শেষ করে প্রুফরিডিং করছেন।


কি যেন একটা ভাবলেন নাইম সালেহ।


-আচ্ছা ধরুন, আপনি আপনার ভবিষ্যৎ পড়ে সেটা বদলানোর চেষ্টা করছেন। তা কি অসম্ভব?

-হ্যাঁ, আমি অনেকবার চেষ্টা করেছি। প্রত্যেকবারই উভয় সঙ্কটে পড়েছি। ডু অর ডাই এর মত অবস্থা।

-যেমন?

-আম… ঐদিন অফিসে আমার বস আমাকে একটা পেনড্রাইভ দিয়েছিলেন। বলেছেন ওটার একটা ফাইলে কিছু EXEL Documents আছে। সেগুলো আমাদের ডেটাবেইস অনুযায়ী কমপ্লিট করে দিতে। এটা আমার ডিপার্টমেন্ট এর কাজ ছিল না, আমাকে কিছু বলার সুযোগও না দিয়ে তিনি ওখান থেকে চলে যান।

বইতে পড়েছিলাম যে আমি কাজটি করিনি। রেখে দেই রাতে বাসায় ফিরে করার জন্য। কিছুক্ষণ পর স্যার এসে ওটা আমার কাছ থেকে নিয়ে যান। আমি অনেকটা অবাক হই, কিন্তু পরে এটা মনে করি যে তিনি হয়তো ভুলেই আমায় ওটা দিয়েছিলেন। পরে আমার থেকে নিয়ে যান। বারকয়েক জিজ্ঞেসও করেছিলেন আমি ওটা ওপেন করেছিলাম কিনা, খুব কনফিডেনশল ছিল নাকি।

আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে কাজটা আমি করব। পেনড্রাইভ পিসির সাথে কানেক্ট করে ফাইল অন করি। ডকিউমেন্টস একদম ফাঁকা, কিচ্ছু নেই। আলাদা কোন ভাবে ওপেন হয় হয়তো, যেহেতু কনফিডেনশল। কিন্তু ইমেজ ফাইলে ঢুকে চোখ কপালে উঠে। প্রায় সাত'শ এর মত ছবি আছে এখানে। প্রায় সবগুলোই বসের, তার সাথে একেকটায় 

একেকজন মহিলা। তবে আমার জানামতে ওদের মধ্যে একজনও বসের স্ত্রী নন।


তখন আমার উপলব্ধি হয় বইয়ের ক্ষমতা। এখন যদি আমি বসকে বলি যে, আমি ওটা ওপেন করেছিলাম কিন্তু কোন ডকিউমেন্টস পাইনি, তাহলে বস সন্দেহের তুঙ্গে থাকবেন যে আমি ঐ ছবিগুলো দেখেছি। কিন্তু, যদি আমি বলি যে ওটা আমি পিসিতে ইনসার্টই করিনি তাহলে বই অনুযায়ী সব আগের মত হবে।


আর বস যদি একবার জানতে পারে যে আমি ওগুলো দেখে ফেলেছি, তাহলে হয়ত উনি আমাকে প্রমোশনের লোভ দেখিয়ে চুপ করাতে চাইবেন। কিন্তু তিনি যে আমাকে চাকরিচ্যুত কিংবা বান্দরবান ট্রান্সফারের ভয় দেখাবেন না, অথবা একদিন কোন এক ষড়যন্ত্র করে কিছুই জানেন না ভাব দেখিয়ে আমাকে চাকরিচ্যুত করবেন না, তারও তো নিশ্চয়তা নেই!


নাইম সালেহ-র চেহারা দেখে মনে হলো যে তিনি সন্তুষ্ট। 

-আমি কি আরও কয়েকটা ঘটনা বলব?

-না, দরকার নেই। 

আবারো চোখ বন্ধ নাইম সালেহ-র। কিছুক্ষণ পর জগ থেকে পানি ঢেলে নিলেন গ্লাসে। গ্লাসটা বাড়িয়ে দেন সেলিমের দিকে, ঢকঢক করে গিলে নেন পুরোটা। 

-ভুল সিদ্ধান্ত নিলে কি হয়?

-মৃত্যু।

চশমাটা একটু সামনে চলে আসলো যেন নাইম সালেহ-র গাড় ভ্রু কুচকানোর জন্য।

'বলতে ভুলে গিয়েছিলাম, বইয়ের শুরুতে একটা ডিসক্লেইমার দেয়া ছিল।

"99% of people couldn't change their future. The man who takes the wrong decision would die"


-আপনি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন?

মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেল লোকটার। এবার শিরদাঁড়া সোজা করে বসলো সে। 

-হ্যাঁ, কাল রাতে।

-তার মানে আপনি মারা যাবেন?

-হ্যাঁ।

-কিভাবে?

-রাস্তা পার হতে গিয়ে, কোন একটা যানবাহনের সাথে এক্সিডেন্ট কিংবা কারো হাতে খুন। এ দুটোই লিখা আছে বইয়ে।

-তাহলে এমন রাস্তা দিয়ে ফিরুন, যেখানে যানবাহন চলেনা।

লোকটা উঠে দাঁড়ায়, ব্যাগ থেকে একটা বই রাখে টেবিলে। ইউর উইল! দরজার দিকে পা বাড়ায়।

-ওদিক দিয়ে গেলে ছিনতাইয়ের শিকার হব। 

-তাহলে আমার এখানে থেকে যান?

-কতদিন আপনি আমাকে রাখবেন এখানে? আর কেই বা বলতে পারে যে আপনি আমায় খুন করবেন না? 


নাইম সালেহ থমকে গেলেন। বলে কি এই লোক? আর সত্যিই কি এই বই... খট করে দরজা বন্ধ হয়ে গেল। বইটা হাতে নিলেন নাইম সালেহ। মাঝারি সাইজের একটা বই। শুরুতেই ডিসক্লেইমার।

"99% of people couldn't change their future. The man who takes the wrong decision would die"

বইটা পড়তে শুরু করলেন নাইম সালেহ। লোকটা নিশ্চয়ই এমন পথ বেছে নেবে যাতে তার মৃত্যু যন্ত্রনা কম হয়।


__


নিজের মৃত্যু যন্ত্রণা কমানো এবং নাইম সালেহকে বাঁচানোর একটাই উপায় আছে তার কাছে। বইটা বন্ধ করলেন সেলিম মির্জা। রাত সাড়ে তিনটা, কারো জেগে থাকার কথা নয়। তারপরও বেডরুমে একবার উঁকি দিলেন, ঘুমিয়ে আছেন তার স্ত্রী। অন্য রুমে ঘুমিয়ে আছে তার ছেলে-মেয়ে। ড্রেসিং টেবিলের সামনে থেকে বডি স্প্রেটা নিলেন। রান্নাঘরে গিয়ে কিচেন নাইফ আর ম্যাচেসটা নিয়ে ড্রইং রুমে এলেন তিনি। জানালা দিয়ে জোঁসনার আলো আসছে, সে আলোয় ঝিলিক দিয়ে উঠলো ছুরির কোণাটা।


বইটা রাখলেন মেঝেতে, তার ওপর স্প্রে করলেন বডি স্প্রেটা। সুগন্ধি অ্যালকোহলযুক্ত বইটার উপর জ্বলন্ত দিয়াশলাই ছেড়ে দিলেন। মুহূর্তে জ্বলে উঠলো চারকোনা একটা আগুনের শিখা। 


চোখ বন্ধ করে সাহস যুগিয়ে চোখ আর দাঁত খিচিয়ে চাকুটা চালিয়ে দিলেন বাঁ হাতের রগের উপর। নেতিয়ে পরলেন তিনি। মেঝেতে জ্বলন্ত বইটির আশেপাশে চিকন ধারায় ফুলকি দিয়ে ছিটকে পরছে সেলিম মির্জার বা'হাতের বহমান রক্ত।



পরিশিষ্ট


সেলিম মির্জা সেই এক পারসেন্ট লোকদের মধ্যে একজন, যারা ভবিষ্যৎ বদলাতে পেরেছেন। তবে আর কিছুক্ষণ জীবিত থাকলে তিনি হয়তো দেখতে পেতেন, অ্যালকোহল পুড়ে হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেও, বইটা অক্ষতই আছে।